নীল খামের রহস্য
— একটি অনির্বাণ সেনের গোয়েন্দা গল্প
সেদিন সন্ধে থেকেই কলকাতায় ঝুম বৃষ্টি নামছিল। গোয়েন্দা অনির্বাণ সেন তার বৈঠকখানায় বসে আয়েশ করে লবঙ্গ চায়ে চুমুক দিচ্ছিল। আমি, অর্থাৎ তার সহকারী বিপ্লব, জানলার বাইরে ল্যাম্পপোস্টের আবছা আলোর দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম, এমন একটা বৃষ্টিভেজা রাতে একটা জমাটি কেস এলে মন্দ হতো না।
ঠিক তখনই দরজার কলিংবেলটা বেজে উঠল।
আমি দরজা খুলতেই ভেতরে প্রবেশ করলেন এক ভদ্রলোক। তাঁর পরনের রেনকোটটা জল ঝরিয়ে একাকার। ভদ্রলোকের বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি, চোখে তীব্র আতঙ্ক। অনির্বাণ সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, "আসুন, ভেতরে আসুন। আমি অনির্বাণ সেন। আর ইনি আমার বন্ধু বিপ্লব।"
ভ ভদ্রলোক সোফায় বসে নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে বললেন, "আমার নাম সোমনাথ চৌধুরী। বালিগঞ্জের চৌধুরী ম্যানশনের মালিক। আমি এক মস্ত বিপদে পড়ে আপনার কাছে এসেছি, মিস্টার সেন।"
"কী হয়েছে খুলে বলুন," অনির্বাণ শান্ত গলায় বলল।
সোমনাথবাবু পকেট থেকে একটা প্লাস্টিকের প্যাকেট বের করলেন। তার ভেতর থেকে বেরোল একটি নীল রঙের খাম। তিনি বললেন, "আজ সকালে আমার ঠিকানায় এই চিঠিটা এসেছে। কোনো ডাকটিকিট নেই, কেউ এসে লেটারবক্সে ফেলে গেছে।"
অনির্বাণ প্যাকেট থেকে সাবধানে নীল খামটি বের করল। খামের ভেতরে একটুকরো সাদা কাগজ, যাতে টাইপ করা হরফে লেখা:
> "আগামী অমাবস্যার রাতে চৌধুরী ভিলার রাজকীয় মুঘল স্বর্ণমুদ্রা তার আসল মালিকের কাছে ফিরে যাবে। ক্ষমতা থাকলে বাঁচান।"
>
অনির্বাণ ভুরু কুঁচকে বলল, "মুঘল স্বর্ণমুদ্রা? সম্রাট আকবরের আমলের সেই বিখ্যাত মোহরটি, যা আপনার পূর্বপুরুষরা পেয়েছিলেন?"
"হ্যাঁ," সোমনাথবাবু মাথা নাড়লেন। "সেটি আমাদের পারিবারিক সিন্দুক, যা একটি অতি আধুনিক ইলেকট্রনিক লকার, তাতে রাখা থাকে। লকারের কোড শুধু আমি আর আমার বিশ্বস্ত ম্যানেজার সুবীর ছাড়া কেউ জানে না। আগামীকালই অমাবস্যা। আমি ভীষণ আতঙ্কে আছি।"
অনির্বাণ একটু হাসল। "চৌধুরী মশাই, আপনি কোনো চিন্তা করবেন না। আগামীকাল রাতে আমি আর বিপ্লব আপনার বাড়িতে ছদ্মবেশে উপস্থিত থাকব। দেখা যাক, এই রহস্যময় চোরের হাত কত লম্বা।"
চৌধুরী ম্যানশনে অমাবস্যার রাত
পরদিন রাতে আমরা যখন বালিগঞ্জের চৌধুরী ম্যানশনে পৌঁছালাম, তখন চারদিক নিস্তব্ধ। আকাশ মেঘলা, যেন যেকোনো সময় ঝড় নামবে। সোমনাথবাবু আমাদের তাঁর খাস কামরায় নিয়ে গেলেন, যেখানে সেই বিশাল লোহার সিন্দুকটি রাখা ছিল। ঘরের জানলাগুলোয় লোহার শক্ত গ্রিল লাগানো, আর ঘরের বাইরে দুজন সশস্ত্র পুলিশ পাহারা দিচ্ছে।
ঘরে উপস্থিত ছিলেন সোমনাথবাবু নিজে, তাঁর ম্যানেজার সুবীর বাবু (যিনি কিছুটা গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ), এবং সোমনাথবাবুর ভাইপো রজত।
অনির্বাণ লকারটি ভালো করে পরীক্ষা করে দেখল। তারপর ঘরের দেওয়ালে ঝুলতে থাকা একটা প্রাচীন ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, "রাত এখন এগারোটা বেজে চল্লিশ। অমাবস্যার তিথি শুরু হতে আর কুড়ি মিনিট বাকি।"
হঠাৎ একটা প্রবল শব্দে বজ্রপাত হলো, আর সেই মুহূর্তেই গোটা বাড়ির বিদ্যুৎ চলে গেল! ঘর অন্ধকার হয়ে গেল।
"সুবীর, জেনারেটরটা চালু করো!" সোমনাথবাবু চিৎকার করে উঠলেন।
সুবীরবাবু পকেট থেকে টর্চ বের করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন জেনারেটর ঘরের দিকে। প্রায় দুই মিনিট পর জেনারেটর চালু হলো এবং আলো ফিরে এল।
কিন্তু আলো আসতেই ঘরে যা দেখলাম, তাতে আমাদের সবার রক্ত হিম হয়ে গেল।
সিন্দুকের ভারী দরজাটা খোলা! আর তার ভেতরের মখমলের বাক্সটি খালি! সম্রাট আকবরের সেই ঐতিহাসিক স্বর্ণমুদ্রা গায়েব!
সোমনাথবাবু মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন, "সব শেষ! পুলিশ বাইরে পাহারা দিচ্ছিল, ঘরের দরজা বন্ধ ছিল, তবে চোর ঢুকল কী করে?"
রজত উত্তেজিত হয়ে বলল, "আমি বলছিলাম না জ্যাঠামশাই, পুলিশের ওপর ভরসা করা ভুল হয়েছে!"
অনির্বাণ কিন্তু শান্ত রইল। সে সিন্দুকের কাছে গিয়ে মেঝের দিকে তাকাল। মেঝেতে কয়েক ফোঁটা জলের দাগ। সে ঘরের এক কোণে রাখা ছাতাগুলোর দিকে তাকাল। ম্যানেজার সুবীরবাবু ঠিক তখনই ঘরে ফিরে এলেন। তার হাতে একটা ভেজা ছাতা।
অনির্বাণ বলল, "চৌধুরী মশাই, চোর বাইরে থেকে আসেনি। চোর এই ঘরের ভেতরেই ছিল এবং সে চুরির পর ঘর থেকে চুরির মাল বাইরে পাচার করতে পারেনি।"
"তার মানে?" রজত অবাক হয়ে প্রশ্ন করল।
অনির্বাণ সুবীরবাবুর দিকে এগিয়ে গেল। "সুবীরবাবু, জেনারেটর চালু করতে যাওয়ার সময় আপনার হাতে এই ছাতাটি ছিল না। কিন্তু আসার সময় আপনি ছাতাটি নিয়ে এসেছেন কেন?"
সুবীরবাবু তোতলানো গলায় বললেন, "বাইরে... বাইরে বৃষ্টি হচ্ছিল জেনারেটর ঘরে যাওয়ার সময়..."
"মিথ্যে কথা!" অনির্বাণ ধমক দিয়ে উঠল। "প্যাসেজ দিয়ে জেনারেটর ঘরে যেতে কোনো খোলা আকাশ পার হতে হয় না। আসলে, বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে আপনি সিন্দুকের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। বিদ্যুৎ চলে যেতেই আপনি সিন্দুকটি খোলেন। আগে থেকেই কোডটি আপনার জানা ছিল। মুদ্রাটি নিয়ে আপনি প্যাসেজে রাখা নিজের এই ভেজা ছাতাটির ভেতরে লুকিয়ে ফেলেন। ভেবেছিলেন, পরে সুযোগ বুঝে ছাতা নিয়ে বেরোনোর সময় মুদ্রাটি পাচার করে দেবেন।"
"প্রমাণ কী?" সুবীরবাবু চিৎকার করে উঠলেন।
অনির্বাণ সুবীরবাবুর হাত থেকে ছাতাটি ছিনিয়ে নিয়ে সজোরে মেঝেতে ঝাড়ল। সঙ্গে সঙ্গে কালো ছাতার ভেতরের খাঁজ থেকে ঝনঝন শব্দে ছিটকে পড়ল উজ্জ্বল এক সোনার মুদ্রা! সম্রাটের সিলমোহর খোদাই করা সেই ঐতিহাসিক স্বর্ণমুদ্রা!
সোমনাথবাবু ও রজত বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। সুবীরবাবু মেঝের দিকে তাকিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন।
বাইরে তখন পুলিশের গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে। অনির্বাণ চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, "কী হে বিপ্লব, বৃষ্টিভেজা রাতের কেসটা কেমন জমল?"
আমি হেসে বললাম, "একদম খাঁটি সোনার মতো, অনির্বাণ!"