নীল ডায়েরির রহস্য
কলমে: জেমি
১. অসময়ের অতিথি
কলকাতার ক্রিক লেনের দোতলার ফ্ল্যাটটিতে তখন সবে সন্ধ্যার অন্ধকার নামতে শুরু করেছে। বাইরে টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছে, সঙ্গে হালকা ঠান্ডা হাওয়া। গোয়েন্দা অনিমেষ রায় তাঁর আরামকেদারায় বসে পাইপ ধরিয়েছেন। উল্টো দিকের সোফায় বসে ল্যাপটপে কী একটা কাজ করছিল তাঁর তরুণ সহকারী দীপ্তেন্দু।
হঠাৎ কলিং বেলটা বেজে উঠল। এই অসময়ে আর এমন দুর্যোগে কে আসতে পারে, তা নিয়ে দুজনের মনেই কৌতূহল জাগল। দীপ্তেন্দু গিয়ে দরজা খুলতেই ঘরে প্রবেশ করলেন মাঝবয়সী এক ভদ্রলোক। তাঁর পরনে দামী কিন্তু কিছুটা ভিজে যাওয়া কোট, চোখে চশমা এবং মুখের অভিব্যক্তিতে স্পষ্ট ভয়ের ছাপ।
ভদ্রলোক ঘরে ঢুকেই বললেন, "আমার নাম হিমাংশু চৌধুরী। আমি খুব বিপদে পড়ে আপনার কাছে এসেছি, মিস্টার রায়।"
অনিমেষবাবু শান্ত গলায় বললেন, "বসুন মিস্টার চৌধুরী। আগে একটু সুস্থির হোন। দীপ্ত, ওনাকে এক কাপ গরম চা দিতে বলো।"
হিমাংশু চৌধুরী সোফায় বসে চশমাটা মুছে নিলেন। তারপর বলতে শুরু করলেন, "আমি পেশায় একজন প্রত্নতাত্ত্বিক। গত সপ্তাহে আমি পুরুলিয়ার একটা পুরোনো রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ থেকে একটা অত্যন্ত প্রাচীন নীল রঙের চামড়ায় বাঁধানো ডায়েরি উদ্ধার করি। ডায়েরিটি কোনো সাধারণ মানুষের নয়, সেটি ছিল অষ্টাদশ শতাব্দীর এক কুখ্যাত ডাকাত সর্দার রঘুনাথ রায়ের। লোকশ্রুতি আছে, রঘুনাথ তাঁর সমস্ত লুঠ করা ধনসম্পদ একটা গোপন জায়গায় লুকিয়ে রেখেছিলেন, আর সেই জায়গার নকশা সংকেত হিসেবে লেখা আছে এই নীল ডায়েরিতে।"
অনিমেষবাবু পাইপে একটা টান দিয়ে বললেন, "আকর্ষণীয়! তা সেই ডায়েরিটি এখন কোথায়?"
হিমাংশু চৌধুরীর গলা কেঁপে উঠল, "সেটাই তো সমস্যা। গতকাল রাতে আমার লেক গার্ডেন্সের বাড়ি থেকে ডায়েরিটি চুরি হয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, আজ সকালে আমি এই চিঠিটা পেয়েছি।"
তিনি পকেট থেকে একটি ভাঁজ করা কাগজ বের করে অনিমেষবাবুর দিকে এগিয়ে দিলেন। কাগজে লাল কালিতে বড় বড় অক্ষরে লেখা ছিল:
> *"ডায়েরির আশা ছেড়ে দাও চৌধুরী। বেশি বাড়াবাড়ি করলে তোমার জীবন প্রদীপ চিরতরে নিভে যাবে।"*
>
২. ঘটনাস্থল পরিদর্শন
পরদিন সকালে বৃষ্টি থামতেই অনিমেষ ও দীপ্তেন্দু হিমাংশু বাবুর লেক গার্ডেন্সের বাড়িতে পৌঁছাল। বাড়িটি বেশ বড় এবং চারপাশটা গাছপালায় ঘেরা। হিমাংশু বাবুর পড়ার ঘরটি ছিল দোতলায়।
অনিমেষবাবু ঘরের চারপাশটা খুব খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন। ঘরের জানলাগুলো ভেতর থেকে বন্ধ ছিল, কেবল একটি জানলার কাচ ভাঙা।
"চোর কি এই জানলা দিয়েই ঢুকেছিল?" দীপ্তেন্দু জিজ্ঞেস করল।
অনিমেষবাবু ভাঙা কাচের টুকরোগুলো পরীক্ষা করে বললেন, "না দীপ্ত। কাচের টুকরোগুলো ঘরের বাইরে পড়ে আছে। তার মানে জানলাটি ঘরের ভেতর থেকে ভাঙা হয়েছে, বাইরে থেকে নয়। চোরকে বোঝাতে হতো যে সে জানলা ভেঙে ঢুকেছে। আসলে চোর ঘরের চাবি দিয়েই ঢুকেছিল।"
"তার মানে ঘরের চাবি যার কাছে থাকে, সেই এই কাজের সঙ্গে যুক্ত?" দীপ্তেন্দুর চোখ চকচক করে উঠল।
"একদম ঠিক," অনিমেষবাবু বললেন। "মিস্টার চৌধুরী, আপনার এই ঘরে আর কার কার যাতায়াত আছে?"
হিমাংশু বাবু একটু ভেবে বললেন, "আমার ব্যক্তিগত সচিব প্রণব, আর আমার ভাগ্নে অর্ক। অর্ক ইদানীং শেয়ার বাজারে অনেক টাকা লোকসান করেছে বলে খুব টাকার শান্তিতে আছে।"
অনিমেষবাবু প্রণব এবং অর্ক—দুজনকেই ডেকে পাঠালেন।
প্রণব বাবু অত্যন্ত ভদ্র এবং শান্ত স্বভাবের মানুষ। তিনি জানালেন, চুরির রাতে তিনি নিজের বাড়িতেই ছিলেন। অন্যদিকে অর্ক কিছুটা উদ্ধত। সে বলল, "মামা তো সবসময় ওইসব পুরোনো আজেবাজে জিনিস নিয়ে থাকেন। আমার ওসব ডায়েরি নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই।"
কিন্তু অনিমেষের তীক্ষ্ণ নজর এড়াল না যে অর্কর হাতের তালুতে একটা সদ্য কেটে যাওয়ার দাগ রয়েছে, যা ব্যান্ডেজ দিয়ে ঢাকা।
৩. সংকেতের খোঁজ
অনিমেষবাবু অর্কর হাতের ক্ষত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতেই সে কিছুটা থতমত খেয়ে বলল, "ও কিছু না, কাল রান্নাঘরে একটা কাচের গ্লাস ভেঙে হাত কেটে গেছে।"
তদন্ত শেষে বাড়ি ফেরার পথে অনিমেষবাবু চুপ করে রইলেন। দীপ্তেন্দু জিজ্ঞেস করল, "কী বুঝলেন স্যার? অর্কই কি চোর?"
"অর্ক সন্দেহভাজন ঠিকই, কিন্তু প্রমাণ ছাড়া কিছু বলা যাচ্ছে না। তাছাড়া ডায়েরিটা চুরি করার পর চোর নিশ্চয়ই পুরুলিয়ার সেই গুপ্তধনের সন্ধানে রওনা দেবে। আমাদেরও পুরুলিয়া যেতে হবে, দীপ্ত," অনিমেষ রায় মৃদু হেসে বললেন।
হিমাংশু বাবুর কাছ থেকে আগেই ডায়েরির কিছু পাতার ছবি নিজের ফোনে তুলে রেখেছিলেন অনিমেষবাবু, যা হিমাংশু বাবু উদ্ধার করার দিন তুলেছিলেন। গাড়িতে যেতে যেতে অনিমেষবাবু সেই ছবিগুলো দেখছিলেন।
ডায়েরির একটি পাতায় লেখা ছিল:
*"মহাবীরের চোখের আলো যেখানে প্রথম পড়ে, ঠিক তার দশ কদম পূর্বে কালভৈরবীর মন্দির। মন্দিরের গর্ভগৃহে শিবলিঙ্গের নিচে শায়িত আছে মহাকালের সম্পদ।"*
অনিমেষবাবু স্বগতোক্তি করলেন, "মহাবীর... চোখের আলো... কালভৈরবী। হুম, সংকেতটা বেশ জটিল।"
৪. পুরুলিয়ার জঙ্গলে
পরদিন ভোরেই অনিমেষ, দীপ্তেন্দু এবং হিমাংশু বাবু পুরুলিয়ার জয়চণ্ডী পাহাড়ের পাদদেশে এসে পৌঁছালেন। হিমাংশু বাবু ডায়েরিটি যে প্রাচীন দুর্গের ধ্বংসাবশেষ থেকে পেয়েছিলেন, সেটি জঙ্গলের বেশ গভীরে।
পুরোনো দুর্গের সামনে এসে অনিমেষবাবু চারপাশটা পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন। সেখানে একটি বিশাল হনুমান (মহাবীর) মূর্তি খোদাই করা ছিল পাথরের গায়ে।
"দীপ্ত, এখন সকাল আটটা। দেখো তো সূর্যের আলো হনুমানজির চোখের ওপর পড়ছে কি না," অনিমেষবাবু নির্দেশ দিলেন।
দীপ্তেন্দু দেখল, সকালের কাঁচা রোদ ঠিক হনুমান মূর্তির চোখের ওপর প্রতিফলিত হয়ে সামনের একটি প্রাচীন পাথরের স্তূপের ওপর গিয়ে পড়ছে।
"স্যার! ওই দেখুন, আলোটা ওই পাথরের ওপর পড়েছে!" দীপ্তেন্দু চিৎকার করে উঠল।
"চমৎকার! ওটাই হলো 'মহাবীরের চোখের আলো'। এবার ওখান থেকে ঠিক দশ কদম পূর্বে চলো," অনিমেষবাবু বললেন।
তাঁরা মেপে মেপে দশ কদম পূর্ব দিকে যেতেই একটি প্রাচীন, প্রায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া মন্দিরের প্রবেশদ্বার দেখতে পেলেন। মন্দিরের দরজার ওপরে ক্ষয়ে যাওয়া খোদাইয়ে লেখা ছিল 'কালভৈরবী মন্দির'।
তাঁরা মন্দিরের ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখতে পেলেন এক কোণে মাটি খোঁড়া হয়েছে। আর সেখানে দাঁড়িয়ে আছে একজন মানুষ, যার হাতে সেই নীল ডায়েরি এবং একটি চাড়ানি (খোঁড়ার যন্ত্র)। সে আর কেউ নয়—হিমাংশু বাবুর ব্যক্তিগত সচিব প্রণব!
তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল অর্ক, কিন্তু তার হাত দড়ি দিয়ে বাঁধা এবং মুখে টেপ লাগানো।
৫. রহস্যের সমাধান
প্রণব তাঁদের দেখে চমকে উঠল এবং পকেট থেকে একটা পিস্তল বের করে অনিমেষবাবুর দিকে তাক করল।
"খবরদার! কেউ এক পা-ও এগোবেন না। এই গুপ্তধন এখন আমার!" প্রণব চিৎকার করে বলল।
অনিমেষবাবু অত্যন্ত শান্ত গলায় বললেন, "প্রণব বাবু, পিস্তলটা নামিয়ে দিন। পুলিশ ইতিমধ্যেই এই জঙ্গল ঘিরে ফেলেছে। আপনি পালাতে পারবেন না।"
আসলে পুরুলিয়া পৌঁছানোর আগেই অনিমেষবাবু স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে জানিয়ে রেখেছিলেন। ঝোপের আড়াল থেকে পুলিশ অফিসাররা রাইফেল তাক করে বেরিয়ে আসতেই প্রণব অস্ত্র ফেলে দিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।
দীপ্তেন্দু তাড়াতাড়ি গিয়ে অর্কর মুখের টেপ খুলে দিল এবং তার বাঁধন কেটে দিল।
অর্ক হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, "মামা, আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমি শেয়ার বাজারে ঋণের জন্য প্রণবদার কাছ থেকে টাকা ধার নিয়েছিলাম। প্রণবদা আমাকে বলেছিল ডায়েরিটা চুরি করে দিলে আমার সব ঋণ মকুব করে দেবে। কিন্তু আমি যখন বুঝতে পারি ও তোমাকে ক্ষতি করতে চায়, আমি রাজি হইনি। ও তখন আমাকে জোর করে ধরে এখানে নিয়ে আসে।"
হিমাংশু বাবু অর্ককে জড়িয়ে ধরলেন।
দীপ্তেন্দু জিজ্ঞেস করল, "কিন্তু স্যার, আপনি কী করে বুঝলেন যে চোর অর্ক নয়, প্রণব বাবু?"
অনিমেষবাবু হেসে বললেন, "খুব সহজ, দীপ্ত। অর্কর হাতের কাটা দাগটা দেখে আমি প্রথমে ভেবেছিলাম ও জানলার কাচ ভেঙে ডায়েরি চুরি করেছে। কিন্তু পরে বুঝলাম, জানলাটি ভেতর থেকে ভাঙা হয়েছিল প্রণব বাবুর চুরির নাটক সাজানোর জন্য। অর্কর হাত কেটেছিল আসলে প্রণব বাবুর সঙ্গে ধস্তাধস্তির সময়, যখন সে ডায়েরিটা প্রণবের হাত থেকে কেড়ে নিতে চেয়েছিল। প্রণব বাবু জানতেন হিমাংশু বাবুর আসল চাবির গোছা কোথায় থাকে। আর তাছাড়া, হিমাংশু বাবুর ঘরের টেবিল থেকে শুধু ডায়েরি নয়, একটি দামী ফাউন্টেন পেনও চুরি গিয়েছিল, যা আমি আজ সকালে প্রণব বাবুর বুক পকেটে গোঁজা অবস্থায় দেখেছি।"
প্রণব বাবু মাথা নিচু করে রইলেন। পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করল।
অনিমেষবাবু মাটি থেকে নীল ডায়েরিটি তুলে হিমাংশু বাবুর হাতে দিয়ে বললেন, "আপনার আমানত আপনার কাছেই রইল মিস্টার চৌধুরী। তবে এবার এটা কোনো সরকারি জাদুঘরে জমা দিয়ে দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।"
হিমাংশু বাবু কৃতজ্ঞতায় হাত জোড় করলেন।
পশ্চিমের আকাশে তখন সূর্য অস্ত যাচ্ছে। জয়চণ্ডী পাহাড়ের বুকে দাঁড়িয়ে অনিমেষ রায় তাঁর পাইপে আর একটা টান দিয়ে বললেন, "চলো দীপ্ত, এবার কলকাতায় ফিরে এক কাপ জমিয়ে চা খাওয়া যাক।"
कोई टिप्पणी नहीं:
एक टिप्पणी भेजें