ছোট গল্পঃ.....শেষ চিঠির অপেক্ষা

 

শেষ চিঠির অপেক্ষা

হরিপদবাবুর বয়স এখন পঁচাত্তর ছুঁইছুঁই। পিঠটা সামান্য ঝুঁকে গেছে, আর চোখের দৃষ্টিতে আগের সেই তীক্ষ্ণতা নেই। কিন্তু তাঁর স্মৃতির খাতাটা এখনও বেশ স্পষ্ট। জীবনের দীর্ঘ চল্লিশটি বছর তিনি এই গ্রামের ডাকপিয়ন হিসেবে কাজ করেছেন। কাঁধে একটা খাঁকি রঙের ব্যাগ ঝুলিয়ে, সাইকেলের বেল বাজিয়ে গ্রামের এ-মাথা থেকে ও-মাথা ছুটে বেড়ানোই ছিল তাঁর জীবন।
এখন তিনি অবসর নিয়েছেন প্রায় দশ বছর হতে চলল। কিন্তু প্রতিদিন বিকেলে এখনও তিনি এসে বসেন গ্রামের পুরোনো বকুলতলার চাতালে। তাঁর হাতে থাকে একটা জীর্ণ, হলদে হয়ে যাওয়া চিঠির খাম।
এই চিঠিটা তাঁর জীবনের এক অপূর্ণ দায়িত্ব, এক অমীমাংসিত রহস্য।
## ১. পুরোনো দিনের কথা
তখন হরিপদবাবুর চাকুরিজীবনের শুরুর দিক। সাইকেল চালিয়ে ধুলো উড়িয়ে তিনি ঘুরে বেড়াতেন। গ্রামে তখন চিঠির কদর ছিল অন্যরকম। কারও ভালো খবর, কারও কান্নার সুর—সবই বয়ে নিয়ে যেত তাঁর ওই খাঁকি ব্যাগটা।
সে বছর বর্ষাকালটা ছিল ভীষণ জাঁকালো। দিনরাত একটানা বৃষ্টি হতো। এমনই এক বৃষ্টির দুপুরে হরিপদবাবুর ব্যাগে একটা চিঠি আসে। প্রেরকের নাম ছিল না, শুধু প্রাপকের জায়গায় লেখা ছিল—"সুরমা দেবী, বকুলতলা লেন"।
সুরমা ছিল এই গ্রামেরই এক মুখচোরা, শান্ত মেয়ে। তার বাবা ছিলেন গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। সুরমার বিয়ের কথা চলছিল কলকাতার কোনো এক পাত্রের সাথে। কিন্তু সুরমা যে গোপনে কাউকে ভালোবাসত, সেটা গ্রামের অনেকেই আন্দাজ করত।
হরিপদবাবু যখন চিঠিটা নিয়ে সুরমাদের বাড়ি পৌঁছান, তখন চারদিক নিস্তব্ধ। বাড়ির দরজায় একটা বড় তালা ঝুলছিল। প্রতিবেশীদের জিজ্ঞেস করে জানতে পারলেন, আগের রাতেই সুরমার বাবা সপরিবারে গ্রাম ছেড়ে চলে গেছেন। কলকাতার পাত্রের সাথেই নাকি তড়িঘড়ি করে বিয়ে ঠিক হয়েছে। কোথায় গেছেন, তার কোনো ঠিকানা কেউ দিতে পারল না।
হরিপদবাবু চিঠিটা ফেরত পাঠাতে পারতেন। কিন্তু তাঁর মনে হয়েছিল, এই চিঠির ভেতরে এমন কিছু আছে যা হয়তো সুরমার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য। তিনি চিঠিটা নিজের কাছে রেখে দিলেন। ভাবলেন, একদিন না একদিন সুরমা নিশ্চয়ই ফিরে আসবে এই গ্রামে।
 ২. সময়ের স্রোত
দিন যায়, মাস যায়, বছর ঘোরে। হরিপদবাবুর মাথার চুল সাদা হয়। গ্রামের মেঠো পথ পিচঢালা রাস্তায় রূপ নেয়। মানুষের হাতের চিঠির জায়গা দখল করে নেয় মোবাইল ফোনের মেসেজ আর কল। বকুলতলার ডাকঘরটা একসময় বন্ধই হয়ে যায়। কিন্তু হরিপদবাবুর অপেক্ষা শেষ হয় না।
প্রতিদিন বিকেলে তিনি বকুলতলায় এসে বসেন। যদি কোনোদিন কোনো অচেনা মুখ এসে দাঁড়ায় তাঁর সামনে!
আজও বিকেলটা একটু মেঘলা। মেঘের ডাক শুনে হরিপদবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবলেন, "সুরমা, তুমি কি আর কোনোদিন ফিরবে না?"
এমন সময় একটি রিকশা এসে থামল বকুলতলার সামনে। রিকশা থেকে নামল এক তরুণী। জিন্স আর ফতুয়া পরা, কাঁধে একটা আধুনিক ব্যাগ। কিন্তু তার মুখের আদলে, বিশেষ করে চোখের চাউনিতে এমন কিছু ছিল যা হরিপদবাবুকে এক ঝটকায় পঞ্চাশ বছর পেছনে ফিরিয়ে নিয়ে গেল।
তরুণীটি চারদিকটা একটু দেখে নিয়ে হরিপদবাবুর দিকে এগিয়ে এল। মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করল, "আচ্ছা দাদু, আপনি কি বলতে পারেন এখানে দেবেন্দ্রনাথ সেনের বাড়িটা ঠিক কোথায় ছিল?"
দেবেন্দ্রনাথ সেন—তিনিই ছিলেন সুরমার বাবা!
হরিপদবাবুর বুকটা ধক করে উঠল। তিনি কম্পিত গলায় জিজ্ঞেস করলেন, "তুমি... তুমি কে মা?"
মেয়েটি হাসল, "আমি অনন্যা। দেবেন্দ্রনাথ সেন আমার দাদামশাই ছিলেন। আর আমার দিদিমার নাম সুরমা দেবী। দিদিমা মাসখানেক আগে মারা গেছেন। মারা যাওয়ার আগে তিনি আমাকে এই গ্রামের কথা বলেছিলেন। তাঁর খুব ইচ্ছে ছিল জীবনের শেষ দিনগুলোতে একবার এই গ্রামে আসার, কিন্তু শরীর সায় দেয়নি। তাই আমি তাঁর কিছু স্মৃতি খুঁজতে এখানে এসেছি।"
 ৩. বৃত্ত সম্পূর্ণ হওয়া
হরিপদবাবুর চোখে জল এসে গেল। তিনি পকেট থেকে সেই হলদেটে, জীর্ণ খামটি বের করলেন। পঞ্চাশ বছর ধরে পরম যত্নে আগলে রাখা চিঠি।
তিনি চিঠিটি অনন্যার দিকে বাড়িয়ে দিলেন। বললেন, "মা, এই চিঠিটা তোমার দিদিমার। আজ থেকে ঠিক পঞ্চাশ বছর আগে এই চিঠিটা তাঁর নামে এসেছিল। আমি তাঁর কাছে এটা পৌঁছে দিতে পারিনি। আজ আমার ছুটি হলো।"
অনন্যা অবাক হয়ে চিঠিটি হাতে নিল। খামের ওপরের লেখাটা দেখেই তার চোখ জলসজল হয়ে উঠল। সে অস্ফুটে বলল, "এটা... এটা আমার দাদামশাইয়ের হাতের লেখা নয়। দিদিমার ডায়েরিতে আমি ঠিক এই হাতের লেখার কিছু চিঠি দেখেছিলাম। এটা নিশ্চয়ই তাঁর সেই হারিয়ে যাওয়া মানুষের চিঠি, যার জন্য তিনি সারাজীবন গোপনে চোখের জল ফেলেছেন।"
অনন্যা চিঠিটি বুকের কাছে চেপে ধরল। তারপর হরিপদবাবুর পা ছুঁয়ে প্রণাম করে বলল, "ধন্যবাদ দাদু। আপনি শুধু একটা চিঠি নয়, আমার দিদিমার জীবনের সবচেয়ে বড় একটা টুকরোকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন।"
হরিপদবাবু বকুলগাছের গায়ে হেলান দিয়ে বসলেন। এক অদ্ভুত শান্তি তাঁর সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ল। মেঘ কেটে গিয়ে বিকেলের শেষ সূর্যকিরণ এসে পড়ল তাঁর হাসিমুখে। আজ সত্যিই তাঁর জীবনের শেষ চিঠিটা সঠিক ঠিকানায় পৌঁছে গেছে।

कोई टिप्पणी नहीं:

एक टिप्पणी भेजें

Featured post

कंचनजंगा Kanchenjunga की यात्रा

  कंचनजंगा (Kanchenjunga) दुनिया की तीसरी और भारत की सबसे ऊंची चोटी है। इसकी यात्रा (ट्रेक या टूर) प्रकृति प्रेमियों और एडवेंचर के शौकीनों क...