সুন্দরবন ভ্রমণের একটি রোমাঞ্চকর কাহিনী

 সুন্দরবন ভ্রমণ মানেই এক অন্যরকম রোমাঞ্চ, যেখানে প্রকৃতির আদিম রূপ আর রোমাঞ্চকর পরিবেশ প্রতি মুহূর্তে গায়ে কাঁটা দেয়। আমার জীবনের অন্যতম সেরা এবং রোমাঞ্চকর এক সুন্দরবন ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিচে তুলে ধরলাম:

 

শীতের এক সকালে আমাদের লঞ্চ যখন গদখালী ঘাট থেকে ছেড়ে দিল, তখন চারপাশ ঘন কুয়াশায় ঢাকা। নদী দিয়ে যত সামনের দিকে এগোচ্ছিলাম, শহুরে কোলাহল মুছে গিয়ে চারপাশটা তত শান্ত আর রহস্যময় হয়ে উঠছিল। একটু পরেই আমরা প্রবেশ করলাম খাঁটি ম্যানগ্রোভ অরণ্যে—যেখানে নদীর দুপাশে ঘন গোলপাতা আর সুন্দরী গাছের সারি।

লঞ্চের ছাদে বসে যখন আমরা দুপাশের জঙ্গল দেখছিলাম, হঠাৎ গাইড ইশারা করে বললেন, "সবাই চুপচাপ ডানদিকে তাকান।"* নদীর ঠিক পাড় ঘেঁষে কাদার ওপর একটা বিশাল কুমির রোদ পোহাচ্ছিল! আমাদের লঞ্চের শব্দে সেটা অলস ভঙ্গিতে চোখ মেলে তাকাল এবং মুহূর্তের মধ্যে চাবুকের মতো লেজ নেড়ে ঘোলা জলে মিলিয়ে গেল। বন্য প্রাণীকে এত কাছ থেকে দেখার সেই প্রথম অনুভূতিটা ছিল এককথায় দারুণ।


আমাদের ভ্রমণের সবচেয়ে থ্রিলিং পার্ট ছিল কটকা অভয়ারণ্য। সেখানে যখন আমরা লঞ্চ থেকে নেমে বনের ভেতরের সরু কাঠের ট্রেইল ধরে হাঁটতে শুরু করলাম, তখন গাইড আমাদের কঠোরভাবে নির্দেশ দিলেন কেউ যেন দলছুট না হয় এবং কোনো শব্দ না করে।

  চারপাশে শ্বাসমূল (Pneumatophores) মাটির ওপর তীরের মতো খাড়া হয়ে আছে।

  বনের ভেতরে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা, শুধু আমাদের পায়ের পাতার নিচে শুকনো পাতার মচমচ শব্দ আর দূরের কোনো অচেনা পাখির ডাক।

  একটু এগোতেই দেখা মিলল একঝাঁক চিত্রা হরিণের। তারা আমাদের দেখেও না দেখার ভান করে গাছের পাতা খাচ্ছিল। কিন্তু বনের এই শান্ত রূপের পেছনেই লুকিয়ে ছিল আসল চেনা আতঙ্ক।

>  হঠাৎ করেই বনের গভীরে একটা বানর তীব্র চিৎকারে ডেকে উঠল, আর সাথে সাথে হরিণগুলো কান খাড়া করে এক ছুটে অদৃশ্য হয়ে গেল। গাইড ফিসফিস করে বললেন, "আশেপাশেই 'বড় মিয়া' (রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার) আছেন। বানর আর হরিণ অ্যালার্ম কল দিচ্ছে।"

সেদিন বাঘ মামার দেখা আমরা সরাসরি পাইনি সত্যি, কিন্তু ওই থমথমে পরিবেশ আর মাটির বুকে বাঘের টাটকা পায়ের ছাপ (Pugmark) দেখে আমাদের যে অবস্থা হয়েছিল, তা সারাজীবন মনে থাকবে। বুকের ভেতর দুরুদুরু কাঁপন আর শিরদাঁড়া দিয়ে বয়ে যাওয়া সেই হিমশীতল স্রোতটাই ছিল সুন্দরবনের আসল রোমাঞ্চ।


ভ্রমণের শেষ আকর্ষণ ছিল রাতে ছোট নৌকায় করে সুন্দরবনের সরু খাঁড়ি বা ক্যানাল ক্রুজিং। চারিদিকের ঘন অন্ধকার আর মাথার ওপর চাঁদের আলো যেন এক মায়াবী জগৎ তৈরি করেছিল। নৌকার ইঞ্জিন বন্ধ করে যখন শুধু লগি ঠেলে আমরা এগোচ্ছিলাম, তখন জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ ছাড়া আর কোনো আওয়াজ ছিল না। হঠাৎ জলের নিচে জোনাকির মতো আলো জ্বলে উঠছিল—সেটা ছিল জলের এক ধরনের বায়োলুমিনেসেন্ট ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন। জঙ্গল আর জলের সেই অদ্ভুত মিতালী এক অপার্থিব অনুভূতির জন্ম দিয়েছিল।


সুন্দরবনের সেই তিন দিন আমাদের শিখিয়েছে প্রকৃতি কতখানি সুন্দর আর একই সাথে কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে। বাঘের দেখা না পেলেও, তার অস্তিত্বের সেই অদৃশ্য উপস্থিতি আর রোমাঞ্চকর মুহূর্তগুলো আজও আমার স্মৃতিতে টাটকা হয়ে আছে।


कोई टिप्पणी नहीं:

एक टिप्पणी भेजें

Featured post

সুন্দরবন ভ্রমণের একটি রোমাঞ্চকর কাহিনী

 সুন্দরবন ভ্রমণ মানেই এক অন্যরকম রোমাঞ্চ, যেখানে প্রকৃতির আদিম রূপ আর রোমাঞ্চকর পরিবেশ প্রতি মুহূর্তে গায়ে কাঁটা দেয়। আমার জীবনের অন্যতম সের...