বৃষ্টির শব্দটা যখন হুট করে বন্ধ হয়ে গেল, তখন অনির্বাণের হাতের চায়ের কাপটা প্রায় ঠাণ্ডা হয়ে এসেছে।
কলকাতার পুরানো এক গলির ওপর তিনতলার ব্যালকনিতে বসে ছিল সে। বিকেলবেলা আচমকা নামা শ্রাবণের বৃষ্টিতে রাস্তাঘাট জলে থইথই। উল্টো দিকের জীর্ণ হলুদ বাড়িটার কার্নিশ থেকে একফোঁটা একফোঁটা জল তখনও টপটপ করে ঝরে পড়ছে।
ঠিক তখনই মোড়ের মাথায় লাল ছাতাটা দেখা গেল।
বিগত তিন বছর ধরে ঠিক এই বৃষ্টির দিনে, একই সময়ে, একই লাল ছাতা মাথায় দিয়ে একটি মেয়ে এই গলি দিয়ে হেঁটে যায়। মেয়েটির মুখ অনির্বাণ কখনো স্পষ্ট দেখেনি। শুধু দেখেছে তার একহাতে থাকে একটা বেশ ভারী কাঠের বাক্স, আর অন্য হাতে সেই টকটকে লাল ছাতা।
অনির্বাণ একজন চিত্রশিল্পী। তার ক্যানভাসে শহরের বহু অলিগলি, ট্রামলাইন, আর অচেনা মুখের ভিড় জায়গা পেয়েছে। কিন্তু এই লাল ছাতার রহস্য সে কিছুতেই এঁকে উঠতে পারেনি। ক্যানভাসে লাল রঙটা দিলেই মনে হতো, কোথায় যেন একটা সুর কেটে যাচ্ছে।
আজ অনির্বাণ আর নিজেকে সামলাতে পারল না। চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলো রাস্তায়।
গলির কাদা-জল পেরিয়ে সে যখন মেয়েটার কাছাকাছি পৌঁছাল, মেয়েটি তখন গলির শেষ মাথায় একটা বন্ধ বইয়ের দোকানের সাটার খোলার চেষ্টা করছিল। দোকানটার নাম ‘অতীতের গল্প’। বহু বছর ধরে ওটা বন্ধ।
"সাহায্য করব?" অনির্বাণ একটু ইতস্তত করে এগিয়ে গেল।
মেয়েটি ঘুরে দাঁড়াল। তার চোখে কোনো বিস্ময় ছিল না, যেন সে জানত অনির্বাণ আসবে। কাজলপরা দুটো শান্ত চোখ। বয়স পঁচিশ-ছাব্বিশের বেশি হবে না।
"সাটারটা বড্ড ভারি, একটু টেনে দেবেন?" মেয়েটির কণ্ঠস্বরটা বৃষ্টির পর বাতাসে ভেসে আসা ছাতিম ফুলের গন্ধের মতো মায়াবী।
অনির্বাণ এগিয়ে গিয়ে এক টানে সাটারটা তুলে দিল। ভেতরে ধুলো আর পুরনো কাগজের গন্ধ।
মেয়েটি হাতের কাঠের বাক্সটা দোকানের কাঠের কাউন্টারে রাখল। তারপর ছাতাটা একপাশে হেলান দিয়ে রেখে বলল, "ধন্যবাদ। আমি জানি আপনি তিন বছর ধরে আমায় ব্যালকনি থেকে দেখেন।"
অনির্বাণ সামান্য লজ্জিত হয়ে বলল, "আসলে... আমি ছবি আঁকি। আপনার এই লাল ছাতা আর কাঠের বাক্সটা আমায় খুব টানে। কিন্তু প্রতিবার ক্যানভাসে আঁকতে গিয়ে আটকে যাই। মনে হয় আসল গল্পটা আমি জানি না।"
মেয়েটি মৃদু হাসল। কাঠের বাক্সের ঢাকনাটা খুলতেই দেখা গেল, ভেতরে থরে থরে সাজানো অজস্র পুরনো চিঠির গোছা আর কিছু ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট ছবি।
"এটা আমার দাদুর দোকান ছিল," মেয়েটি বলতে শুরু করল, "দাদু বলতেন, মানুষ যখন খুব একা হয়ে যায়, তখন সে তার পুরানো স্মৃতিগুলো কোনো জায়গায় গুটিয়ে রাখতে চায়। এই দোকানটা ছিল শহরের মানুষের হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি জমা রাখার জায়গা। দাদু মারা যাওয়ার পর আমি বছরে একদিন আসি—এই বৃষ্টির দিনে। শহরের বাতাস থেকে কিছু পুরনো স্মৃতি এই বাক্সে বন্দি করে নিয়ে যাই।"
অনির্বাণ অবাক হয়ে বলল, "স্মৃতি বন্দি করেন? কীভাবে?"
"যে গল্পগুলো কেউ শোনেনি, যে চিঠিগুলো কেউ পাঠাতে পারেনি, সেগুলোকে আমি আমার ক্যানভাসে বা খাতায় জায়গা দিই। কিন্তু এবার মনে হয় আমার কাজ শেষ," মেয়েটি বাক্সের ভেতর থেকে একটা বাঁধাই করা খালি ক্যানভাস বের করে অনির্বাণের দিকে বাড়িয়ে দিল। "এবার আঁকার দায়িত্ব আপনার।"
"মানে?" অনির্বাণ ক্যানভাসটা হাতে নিল।
"আপনি প্রতি বছর আমায় দেখতেন, কারণ আপনার ক্যানভাসে একটা শহরের গল্প বাকি ছিল। সেই গল্পটা কোনো লাল ছাতার নয়, সেই গল্পটা এই হারিয়ে যাওয়া সময়টার।"
মেয়েটি ছাতাটা হাতে তুলে নিল। বৃষ্টি আবার মৃদু ছন্দে শুরু হয়েছে।
"আপনার নামটা জানা হলো না?" অনির্বাণ তাড়া তাড়ি বলে উঠল।
"নামে কী আসে যায়? শহরের যেকোনো পুরনো বৃষ্টির গল্পে আমায় খুঁজে পাবেন," বলতে বলতে মেয়েটি আবার লাল ছাতাটা মেলে ধরে গলির মোড়ের দিকে হাঁটতে শুরু করল।
অনির্বাণ দাঁড়িয়ে রইল ক্যানভাসটা হাতে নিয়ে। সে খেয়াল করল, এবার আর তার মনে কোনো দ্বিধা নেই। তুলি আর রঙের অভাব সে আর বোধ করছে না। সে বুঝতে পারল, লাল রঙটা কোনো বস্তুর নয়, ওটা ছিল এই শহরের বুকে জমে থাকা মায়াময় অনুভূতির।
অনির্বাণ দ্রুত ঘরে ফিরে এলো। ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে এখন আর সে বৃষ্টি দেখছে না—তার ইজেলের সামনে নতুন ক্যানভাস প্রস্তুত। আজ প্রথমবার সে সেই লাল ছাতাটা নিখুঁতভাবে এঁকে ফেলল, যার নিচে হেঁটে চলেছে আস্ত একটা শহর।
कोई टिप्पणी नहीं:
एक टिप्पणी भेजें