ছোট গল্পঃ ....ফেরা

 ফেরা.......

স্টেশনের ঘড়িতে তখন রাত এগারোটা। কুয়াশায় চারপাশটা কেমন যেন ধোঁয়াটে হয়ে আছে। প্ল্যাটফর্মের শেষ মাথায় একা দাঁড়িয়ে ছিল সৌমেন। পকেটে হাত দিয়ে সে একটা পুরনো ট্রেনের টিকিট আঙুল দিয়ে মোচড়াচ্ছিল। টিকিটটা আজকের নয়, ঠিক পাঁচ বছর আগের।

পাঁচ বছর আগে এই স্টেশন থেকেই সে শহর ছেড়ে পালিয়েছিল। ক্ষোভ, অভিমান আর একটা তীব্র জেদ কাজ করছিল তখন। বাবা বলেছিলেন, "নিজের পায়ে না দাঁড়িয়ে এ বাড়িতে ফিরবি না।" সৌমেনও চ্যালেঞ্জ নিয়েছিল। কলকাতায় গিয়ে দিনরাত এক করে কাজ করেছে, আজ সে একটা বড় কোম্পানির ম্যানেজার। পকেটে টাকা আছে, পরনে দামি কোট। কিন্তু মনের ভেতরের সেই জেদের জায়গাটা আজ কেমন যেন ফাঁকা লাগছে।

বিকেলেই খবর পেয়েছে বাবা স্ট্রোক করে হাসপাতালে। জেদটা এক মুহূর্তেই কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সব কাজ ফেলে প্রথম যে ট্রেনটা পেয়েছে, সেটাতেই উঠে পড়েছে সে।

স্টেশন থেকে বেরোতেই চেনা গন্ধটা সৌমেনকে ছুঁয়ে গেল। সেই ছাতিম তলার মোড়, চায়ের দোকানটা আজ বন্ধ, কিন্তু সাইনবোর্ডটা একই আছে। একটা রিকশা নিয়ে সে যখন বাড়ির গলির মুখে পৌঁছাল, তখন চারদিক নিস্তব্ধ।

বাড়ির সদর দরজাটা খোলাই ছিল। ভেতরে ঢুকতেই সৌমেন দেখল, বারান্দার সেই পুরনো ইজিচেয়ারটায় বাবা বসে আছেন। চুলে পাক ধরেছে অনেক, আগের সেই চওড়া কাঁধ দুটো কেমন যেন ঝুঁকে গেছে। স্ট্রোকের ধাক্কাটা লেগেছে, তবে সামলে উঠেছেন। সৌমেনকে দেখে বাবা চমকে উঠলেন না, যেন জানতেন ছেল ফিরবেই।

সৌমেন ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে বাবার পায়ের কাছে বসল। এতদিনের জমে থাকা সব অভিমান, অহংকার এক মুহূর্তে চোখের জল হয়ে বেরিয়ে এলো। সে শুধু বলল, "আমি এসে গেছি, বাবা।"

বাবা কাঁপা কাঁপা হাতটা সৌমেনের মাথায় রাখলেন। মুখে কোনো বাড়তি কথা বললেন না, শুধু চশমাটা খুলে মুছে নিয়ে মৃদু হেসে বললেন, "হাত-মুখ ধুয়ে আয়। তোর মা তোর প্রিয় ক্ষীরের সন্দেশ বানিয়ে রেখেছে।"

সৌমেন বুঝল, পৃথিবীর কিছু হিসেব কখনো বদলায় না। জেতার জন্য কখনো কখনো হেরে গিয়ে বাড়ি ফিরে আসতে হয়।


कोई टिप्पणी नहीं:

एक टिप्पणी भेजें

Featured post

ছোট গল্পঃ ....ফেরা

  ফেরা....... স্টেশনের ঘড়িতে তখন রাত এগারোটা। কুয়াশায় চারপাশটা কেমন যেন ধোঁয়াটে হয়ে আছে। প্ল্যাটফর্মের শেষ মাথায় একা দাঁড়িয়ে ছিল সৌমেন। পকেট...