ছোট গল্প ...বিরক্তির মহাকাব্য

 বাঙালির জীবনের সবচেয়ে বড় রোমাঞ্চ কী জানেন? গোয়েন্দা গল্প বা হরর সিনেমা নয়। আসল রোমাঞ্চ হলো— রবিবারের দুপুরে টানটান হয়ে ঘুমানোর ঠিক ৫ মিনিট আগে কলিংবেলের আওয়াজ।

আজকে আপনাদের শোনাবো অনির্বাণের জীবনের তেমনই এক "বিরক্তির মহাকাব্য"।

চরিত্র পরিচয়:

 অনির্বাণ: একজন সাধারণ চাকুরিজীবী, যার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য রবিবারের দুপুরে সাড়ে তিন ঘণ্টা নিশ্ছিদ্র ঘুম দেওয়া।

 ঝন্টুদা: পাড়ার মহাবিরক্তিকর, সবজান্তা প্রতিবেশী। যার মূল কাজ অসময়ে লোকের বাড়ি ঢুকে চা খাওয়া আর জ্ঞান দেওয়া।


রবিবার দুপুর দুটো। অনির্বাণ মাত্র চার পিস খাসির মাংস আর এক থালা বাসন্তী পোলাও পেটে চালান করে বিছানায় শুয়েছে। এসি-টা ঠিক ২২ ডিগ্রিতে সেট করা। বাইরে গনগনে রোদ। অনির্বাণ যেই না চাদরটা গায়ে টেনে চোখটা বুজেছে...

"ট্রিং ট্রিং... ট্রিং ট্রিং...!!!

কলিংবেলটা যেন অনির্বাণের কানের পর্দায় এসে তবলার বোল তুলল। অনির্বাণ মনে মনে বিড়বিড় করল, "ভগবান, প্লিজ যেন কোনো কুরিয়ার বয় হয়। ওটিপি নিয়ে চলে যাবে।"

দরজা খুলতেই অনির্বাণের হার্টফেল হওয়ার জোগাড়। সামনে দাঁড়িয়ে ঝন্টুদা! পরনে লুঙ্গি আর স্যান্ডো গেঞ্জি, মুখে একগাল পান।

> "কী রে অনু? ঘুমোচ্ছিস নাকি? আরে এই অসময়ে কেউ ঘুমোয়? তোদের এই জেনারেশনটাই অলস হয়ে গেল!"

অনির্বাণ মনে মনে বলল, "না ঝন্টুদা, আমি তো দুপুরে স্যান্ডো গেঞ্জি পরে দরজায় দরজায় কত্থক নাচ অনুশীলন করি!" কিন্তু মুখে কাঁচুমাচু হেসে বলল, "আসুন ঝন্টুদা... একটু শুয়েছিলাম আর কী।"


ঝন্টুদা ঘরে ঢুকেই সোফাটায় এমনভাবে গ্যাঁট হয়ে বসল, যেন ওটা ওনার পৈতৃক সম্পত্তি।

  "তোর এসিটা থেকে একটু আওয়াজ হচ্ছে না রে? কম্প্রেসরটা কাঁপছে। আমার চেনা একটা ছেলে আছে, পল্টু। ওকে ডাকবি, সস্তায় করে দেবে।" (অনির্বাণের এসি একদম নতুন, মাত্র ব্র্যান্ড নিউ কিনেছে!)

  "বউমা কোথায়? বা বা, এই দুপুরে ঘুমাচ্ছে? আমাদের আমলে বউমারা দুপুরে কাঁথা সেলাই করত, বড়ি দিত..."

  "তা, একটু চা হবে নাকি? চিনি ছাড়া লিকার। আদা দিস একটু।"

অনির্বাণ রান্নাঘরে গিয়ে লিকার চা বানাতে বানাতে নিজের চুল নিজে ছিঁড়তে লাগল। গ্যাসের আগুনে চায়ের সাথে সাথে ওর রবিবারের ঘুমটাও পুড়ে ছাই হয়ে গেল।


চা নিয়ে ড্রয়িংরুমে আসতেই ঝন্টুদা শুরু করল দেশের রাজনীতি, শেয়ার বাজার আর ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে তার নিজস্ব পিএইচডি লেভেলের থিওরি। অনির্বাণের চোখ তখন ঘুমে বুজে আসছে। সে শুধু রোবটের মতো "হুঁ", "হ্যাঁ", "তাই নাকি" করে যাচ্ছে।

হঠাৎ অনির্বাণের মাথায় একটা শয়তানি বুদ্ধি খেলল। বিরক্তি যখন চরম সীমায় পৌঁছায়, তখন মানুষ যেকোনোও ঝুঁকি নিতে পারে।

অনির্বাণ হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বলল, "ঝন্টুদা, একটা দরকারি কথা ছিল। ভালোই হলো আপনি এলেন।"

ঝন্টুদা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল, "কী রে? কোনো সমস্যা?"

> "আসলে ঝন্টুদা, অফিস থেকে এই মাসে ইনক্রিমেন্ট তো দেয়ইনি, উল্টে একটা প্রজেক্টের গাফিলতির জন্য আমার বেশ কিছু টাকা জরিমানা করেছে। ক্রেডিট কার্ডের বিল বাকি, বাড়ির ইএমআই আটকে গেছে। ভাবছিলাম পাড়ার কারোর থেকে লাখ খানেক টাকা ধার চাইব। আপনি যখন এলেন... মানে, আপনি তো জ্যাঠামশাইয়ের মতো..."

"টাকা" আর "ধার" শব্দ দুটো শোনামাত্র ঝন্টুদার গলার চা আটকে গেল। পর পর তিনটে কাশি দিয়ে ঝন্টুদা সোজা উঠে দাঁড়াল। পকেট থেকে তড়িঘড়ি ফোনটা বার করে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে এমন মুখ করল যেন ওপার থেকে খোদ আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ফোন করেছেন।

> "অ্যাঁ? হ্যাঁ রে গদাই? আমি আসছি... আসছি! আরে অনু, ওই গদাইয়ের পিসেমশাইয়ের কী একটা ইমার্জেন্সি হয়েছে রে, আমাকে এখনই যেতে হবে। চায়ের কাপটা রাখলাম। আর এসির ফিল্টারটা পরিষ্কার করিস!"

ঝন্টুদা চটি জোড়া বগলে নিয়ে যেভাবে সিঁড়ি দিয়ে নামল, তা অলিম্পিকের ১০০ মিটার দৌড়বিদদেরও টেক্কা দিতে পারে।

অনির্বাণ দরজাটা লক করে একটা গভীর স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। ঘড়িতে তখন বিকেল সাড়ে তিনটে। খাসির মাংসের ঘুমটা ততক্ষণে উবে গেছে, মাথাটা ঝিমঝিম করছে। কিন্তু অনির্বাণের মুখে একটা যুদ্ধ জয়ের হাসি।

সে আবার বিছানায় গিয়ে শুলো। রবিবারের ঘুমটা হয়তো মাটি হলো, কিন্তু ঝন্টুদার মতো "বিরক্তির পারমাণবিক বোমা" কে যেভাবে সে নিষ্ক্রিয় করেছে, তার আনন্দ ওই সাড়ে তিন ঘণ্টার ঘুমের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়!

শিক্ষা: সব বিরক্তির ওষুধের নাম "টাকা ধার চাওয়া"। প্রয়োগ করে দেখুন, ফল হাতেনাতে!


कोई टिप्पणी नहीं:

एक टिप्पणी भेजें

Featured post

ছোট গল্প ...বিরক্তির মহাকাব্য

 বাঙালির জীবনের সবচেয়ে বড় রোমাঞ্চ কী জানেন? গোয়েন্দা গল্প বা হরর সিনেমা নয়। আসল রোমাঞ্চ হলো— রবিবারের দুপুরে টানটান হয়ে ঘুমানোর ঠিক ৫ মিনিট...