গোয়েন্দা গল্প ....কুয়াশার ওপারে

 কুয়াশার ওপারে

সেদিন সন্ধে থেকেই কলুটোলার পুরোনো চারতলা বাড়িটার চারপাশ কুয়াশায় ঢেকে গিয়েছিল। ঘড়িতে তখন ঠিক রাত নটা। বিখ্যাত বেসরকারি গোয়েন্দা অনিমেষ চ্যাটার্জি তাঁর আরামকেদারায় বসে পাইপে শেষ টানটা দিচ্ছেন, এমন সময় দরজায় মৃদু টোকা পড়ল।

ভেতরে ঢুকলেন এক ভদ্রলোক। পরনে দামী কিন্তু কিছুটা কুঁচকানো স্যুট, চোখে চশমা, আর মুখে তীব্র আতঙ্কের ছাপ। ভদ্রলোক নিজের পরিচয় দিলেন—অরিন্দম বসু, শহরের নামী হিরে ব্যবসায়ী।

"আমায় বাঁচান মিস্টার চ্যাটার্জি," সোফায় বসতে বসতে বললেন অরিন্দমবাবু। "আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস, 'নীল নক্ষত্র' হিরেটা আজ সন্ধেয় আমার সেফ থেকে চুরি হয়ে গেছে। আর আশ্চর্যের বিষয়, ঘরের দরজা-জানলা সব ভেতর থেকে বন্ধ ছিল!"

অনিমেষবাবু পাইপটা অ্যাশট্রেতে রেখে সোজা হয়ে বসলেন। তাঁর চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠল। "আকর্ষণীয়! বন্ধ ঘরের রহস্য। তা, ঘটনার সময় বাড়িতে কে কে ছিল?"

"শুধু আমার তিনজন বিশ্বস্ত মানুষ," অরিন্দমবাবু বললেন। "আমার ব্যক্তিগত সেক্রেটারি সমীর, বহুদিনের পুরোনো রাঁধুনি হরিপদ, আর আমার ভাগ্নে বিক্রম। আমি ছাড়া সেফের কোড আর কেউ জানে না। অথচ সেফটা কোনো ভাঙচুর ছাড়াই খোলা হয়েছে!"

 ঘটনাস্থলে অনিমেষ

আধ ঘণ্টার মধ্যে অনিমেষবাবু তাঁর সহকারী তরুণকে নিয়ে অরিন্দমবাবুর আলিপুরের বাংলোয় পৌঁছালেন। দোতলার সেই ঘরটি নিপুণভাবে পরীক্ষা করতে লাগলেন অনিমেষ।

 সেফ: ঘরের কোণে রাখা লোহার সেফটি একদম অক্ষত, কোনো আঁচড়ের দাগ নেই।

 জানলা: ভেতরের ছিটকিনি শক্ত করে আটকানো।

 মেঝে: ঘরের কার্পেটে হালকা কাদার দাগ, যা বাইরের জুতো থেকে আসতে পারে।

অনিমেষবাবু তিন সন্দেহভাজনকে একে একে জেরা করতে ডাকলেন।

১. হরিপদ (রাঁধুনি): "বাবু, আমি রাত আটটা থেকে সাড়ে আটটা পর্যন্ত নিচে রান্নাঘরে রুটি বেলছিলাম। ওপরতলায় কে এসেছে আমি জানি না।"

২. সমীর (সেক্রেটারি): "আমি পাশের ঘরে বসে ল্যাপটপে আগামী সপ্তাহের হিসেব মেলাচ্ছিলাম। কারেন্ট চলে যাওয়ার পর আমি একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে কাজ করছিলাম।"

৩. বিক্রম (ভাগ্নে): "আমি আমার ঘরে বসে হেডফোন লাগিয়ে গান শুনছিলাম আর মোবাইলে গেম খেলছিলাম। কোনো আওয়াজ পাইনি।"

 সত্যের সন্ধান

সব শুনে অনিমেষবাবু ঘরের ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ালেন। বাইরে তখনও টিপটিপ বৃষ্টি আর কুয়াশা। হঠাতই ঘরের টেবিলের ওপর রাখা একটা ডায়েরির দিকে তাঁর চোখ গেল। ডায়েরির পাতাগুলো ওল্টাতে ওল্টাতে তিনি মুচকি হাসলেন।

"তরুণ, কেস খতম," অনিমেষবাবু বললেন। "অপরাধী নিজেই নিজের ফাঁদ পেতেছে।"

অনিমেষবাবু ড্রয়িংরুমে সবাইকে ডাকলেন। অরিন্দমবাবু অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছেন।

"মিস্টার বসু," অনিমেষবাবু বলতে শুরু করলেন, "চোর বাইরের কেউ নয়। আর সেফ খোলার জন্য কোড চুরি করারও প্রয়োজন পড়েনি। অপরাধী চাবি বা কোড ছাড়াই হিরেটা সরিয়েছে, কারণ সেফটি আসলে খোলাই ছিল!"

সবাই চমকে উঠল।

"মানে?" অরিন্দমবাবু অবাক।

"আজ বিকেল ৫টায় ব্যাংক থেকে ফেরার পর আপনি যখন সেফে টাকা রাখছিলেন, তখন আপনার সেক্রেটারি সমীরবাবু আপনাকে কফি এনে দেন। ঠিক সেই সময় আপনার মোবাইলে একটা জরুরি ফোন আসে। আপনি ফোনে কথা বলতে বলতে ঘর থেকে বেরিয়ে যান, সেফটি লক করতে ভুলে যান। সমীরবাবু সেই সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন।"

সমীর ফ্যাকাশে মুখে বলল, "মিথ্যে কথা! আমি তো পাশের ঘরে মোমবাতি জ্বালিয়ে কাজ করছিলাম। কারেন্ট ছিল না।"

"ঠিক এখানেই তুমি ভুলটা করলে সমীরবাবু," অনিমেষবাবু ডায়েরিটা তুলে ধরলেন। "আজ সন্ধে ৭টা থেকে সাড়ে ৭টা পর্যন্ত এই এলাকায় লোডশেডিং ছিল, এটা ঠিক। কিন্তু তুমি বললে তুমি মোমবাতির আলোয় 'ল্যাপটপে' হিসেব মেলাচ্ছিলে। ল্যাপটপের তো নিজস্ব ব্যাটারি থাকে, তার জন্য মোমবাতির আলোর দরকার হয় না। আসলে তুমি কারেন্ট যাওয়ার অন্ধকারে মিস্টার বসুর ঘরে ঢুকে হিরেটা সরিয়ে নাও। আর তাড়াহুড়ো করে বেরোনোর সময় তোমার ভেজা জুতোর কাদার দাগ কার্পেটে লেগে যায়।"

সমীর আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ল। "আমায় ক্ষমা করুন স্যার, শেয়ার বাজারে আমার অনেক ঋণ হয়ে গিয়েছিল..."

রাত এগারোটা। বাংলোর বাইরে কুয়াশা আরও ঘন হয়েছে। গাড়িতে ওঠার আগে তরুণ জিজ্ঞেস করল, "আচ্ছা স্যার, সমীর যে ল্যাপটপে কাজ করার মিথ্যে অজুহাত দিচ্ছিল, সেটা তো বুঝলাম। কিন্তু সেফ যে খোলাই ছিল, সেটা আপনি কী করে জানলেন?"

অনিমেষবাবু হেসে বললেন, "খুব সোজা, তরুণ। অরিন্দমবাবুর সেফটি ডিজিটাল। ওটা যদি ভুল কোড দিয়ে বা জোর করে খোলার চেষ্টা হতো, তবে স্বয়ংক্রিয় অ্যালার্ম বেজে উঠত। আর যদি সঠিক কোড দিয়ে খোলা হতো, তবে মিস্টার বসুর মোবাইলে একটা ওটিপি বা নোটিফিকেশন আসত। তার কিছুই হয়নি। তার মানে, সেফটি আগেই লক করা হয়নি। অতি সাবধানী মানুষও কখনো কখনো অমনোযোগী হয়ে পড়ে, আর চোরেরা ঠিক সেই মুহূর্তটারই খোঁজ করে।"

গাড়ি স্টার্ট নিল। অনিমেষবাবু আবার তাঁর পাইপটা ধরালেন, আর ধোঁয়ার কুন্ডলী বাংলোর কুয়াশায় মিশে গেল।


कोई टिप्पणी नहीं:

एक टिप्पणी भेजें

Featured post

গোয়েন্দা গল্প ....কুয়াশার ওপারে

  কুয়াশার ওপারে সেদিন সন্ধে থেকেই কলুটোলার পুরোনো চারতলা বাড়িটার চারপাশ কুয়াশায় ঢেকে গিয়েছিল। ঘড়িতে তখন ঠিক রাত নটা। বিখ্যাত বেসরকারি গোয়েন...